ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র (বিউবো) ঘিরে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি ও ভুয়া মামলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে-২০২২ সালে হবিগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে আসা ছতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ যোগদানের পর থেকেই স্থানীয় দালাল ও অস্থায়ী কর্মচারীদের নিয়ে একটি ঘুষ বানিজ্যের সিন্ডিকেট সক্রিয় করে তুলেছেন। তার এই সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সুবিধাভোগীরা। সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, দিনমজুর, এমনকি মসজিদের ইমাম মোয়াজ্জেমকেও কারাগারে পাটানোর অভিযোগ উটেছে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি ছাতক বিউবো অফিসের প্রায় প্রতিটি সেবা-লাইন সংস্কার, মিটার/ট্রান্সফরমার পরিবর্তন, নতুন সংযোগ-সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত অর্থ না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, মিটার না দেখে অতিরিক্ত বিল দেওয়া, একজনের বকেয়া বিলের মামলা আরেকজনের নামে দেওয়া-এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন ভুক্তভোগীদের শতশত অভিযোগ–মন্তব্য এখন উপজেলাজুরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহে গেলে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরাও আব্দুল মজিদের তোপের মুখে পড়েছেন,
যা উপজেলায় ‘টপ অব দ্য টক’ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
গত ২৬ অক্টোবর ইসলামপুর ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ হাসান রুহেল বকেয়া বিলের মামলায় গ্রেপ্তার হন। কিন্তু জামিনে বের হয়ে তিনি জানতে পারেন-একই গ্রামের বাসিন্ধা মাহবুব স্টোন ক্রাশারের মালিক নাজমুল হুদার বকেয়া বিলের মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। হয়রানি মূলক এ মামলার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ভুক্তভোগী কে-সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে শর্ত সাপেক্ষে আপোষের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এমনই অভিযোগ করেছেন পৌর এলাকার চরেরবন্দ গ্রামের সাবেক কাউন্সিলর মাসুক মিয়া, রুবেল আহমদ সহ বেশ কয়েকজন। কি কারণে মামলা হয়েছে তা কেইউ জানেন না।
দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের এক মসজিদের সভাপতি ও ছৈল-আফজালাবাদ ইউনিয়নের এক মসজিদের ইমামকেও জেল খাটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনেকেই জানান-তাদের কথামত ঘুষ না দেওয়ায় এপথ বেচে নেওয়া হয়েছে। যা ঘুষ বানিজ্যের সহায়ক হিসেবে চাপ তৈরির কৌশল।
এক ভুক্তভোগীর সরবরাহ করা ৩ মিনিটের একটি ভিডিওতে-অফিসের একজন কর্মকর্তা কথোপকথনের মাঝে ঘুস দাবির বিষয় উটে আসছে। এমন কি সেই অর্থ নাকি উপরের বড় কর্মকর্তাদেরও দিতে হয়-এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
এছাড়া কালারুকা গ্রামে মাত্র কয়েকটি খুঁটি বদলাতে খুঁটি প্রতি ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভেরাজপুরে এক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক জানিয়েছেন মাত্র ১২৫০/ টাকার মিটারের মুল্য তার কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা নিয়েও গত চার মাস যাবত কাজ হয়নি,অসহায় ভিক্ষুক এর বিচারের দাবী করেছেন। পৌরশহরের দক্ষিণ বাগবাড়িতে একটি ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করে ২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার করছখালি গ্রামের এক ভুক্তভোগী জানান মিটার পরিবর্তনের জন্য তার কাছে ৮০ হাজার টাকা দাবী করা হয়, পরবর্তীতে দামদর করে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে তা করা হয়েছে।
এরখম শতশত অভিযোগ বর্তমানে উপজেলার সর্বত্র ঘুরছে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ-অফিসের নারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে গাড়িচালক, চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং কয়েকজন বাইরের দালাল-সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। সিন্ডিকেটের সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিজ অফিসেই আপোষ বৈঠক বসান’ নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০২২ সালে হবিগঞ্জের আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালনের সময় আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে বহুমুখী অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে-সেই সময় তাকে প্রায় ২০ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছিল।
এছাড়া ডিপিডিসির আরও ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও একই সময়ে অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর বৈষম্যবিরোধী প্রকৌশলী পরিষদ একাধিক বিদ্যুৎ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও অপসারণের দাবি জানায়-সেই তালিকায় আব্দুল মজিদের নামও ছিল। ওই সময় আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াতেই তিনি বেপরোয়া হয়ে উটেছেন বলে সচেতন মহলের ধারণা।
একটি সূত্র জানিয়েছে ইতিপুর্বে গত ৩ নভেম্বর তাকে ছাতক থেকে বান্দরবানে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। তিনি নানাভাবে এ বদলি ঠেকাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এত কিছুর পরও আব্দুল মজিদ রয়েছেন বহাল তবীয়তে।
এসব বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ কোনো বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলেও সিলেট বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল কাদের বলেছেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতেছি। যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এছাড়া অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।