বিশ্বজিৎ পাল, বিশেষ প্রতিনিধি রাজবাড়ী
রাজবাড়ী জেলার ধূসর হয়ে যাওয়া ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অমূল্য রত্নগুলোকে এক মলাটে বন্দি করল রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন
গত ১ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের আয়োজনে উন্মোচিত হলো এক মূল্যবান স্মারক গ্রন্থ। জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সুলতানা আক্তার-এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত এই বইটি রাজবাড়ীর অতীত ও বর্তমানের এক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণসমূহ:
প্রধান অতিথি: জনাব সুলতানা আক্তার, জেলা প্রশাসক, রাজবাড়ী।
বিশেষ প্রাপ্তি: জেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ক্ষীর চমচম’-কে জি.আই. (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির অগ্রগতির ঘোষণা।
অংশগ্রহণ: স্থানীয় লেখক, গবেষক, সাংবাদিক এবং গুণীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
বইটিতে যা থাকছে:
এই গ্রন্থটি কেবল একটি বই নয়, বরং রাজবাড়ীর আত্মার প্রতিচ্ছবি। এতে স্থান পেয়েছে:
পণ্ডিত কাজী আবুল হোসেন ও শিল্পী মনসুর উল করিমের জীবন ও কর্ম।
ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন।
মৃৎশিল্প, লোকজ খেলা এবং বিলুপ্তপ্রায় লোক-সংস্কৃতি।
রাজবাড়ীর ভাষা, নৃ-তাত্ত্বিক বৈচিত্র্য এবং সাংবাদিকতার ইতিহাস।
বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দসহ সকল উপজেলার সাংস্কৃতিক বিবর্তন।
”আশা করছি বইটি ইতিহাসপ্রেমীসহ এ অঞ্চল নিয়ে যারা ভবিষ্যতে গবেষণা করতে চান তাদের চিন্তার খোরাক যোগাবে।” — সুলতানা আক্তার, জেলা প্রশাসক।
লেখক ও গবেষকদের প্রতি শ্রদ্ধা
বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরি থেকে প্রকাশনা পর্যন্ত বালিয়াকান্দির আড়কান্দির সৃজনশীল লেখক নারায়ণ দেবনাথসহ যারা শ্রম দিয়েছেন, তাদের এই অবদান রাজবাড়ীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।আড়কান্দি জনপদের আখ্যান ও লেখক নারায়ণ দেবনাথ
বইটিতে রাজবাড়ীর বিভিন্ন প্রান্তের আঠারোজন বিশিষ্ট লেখকের গবেষণামূলক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে লেখক নারায়ণ দেবনাথ-এর লেখা “আড়কান্দি জনপদের অমৃত কথা” শীর্ষক নিবন্ধটি।
বালিয়াকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আড়কান্দি জনপদের ইতিহাস, সেখানকার মানুষের জীবনসংগ্রাম, কৃষ্টি এবং মাটির ঘ্রাণ লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন। নিজের লেখাটি জেলা পর্যায়ের এমন একটি দালিলিক গ্রন্থে স্থান পাওয়ায় লেখক নারায়ণ দেবনাথ জেলা প্রশাসক মহোদয়সহ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই লেখনীর মাধ্যমে আড়কান্দির গৌরবময় ইতিহাস বিশ্বদরবারে নতুন করে পরিচিতি পাবে।
কী আছে এই মহা-গ্রন্থে?
বইটির পরতে পরতে সাজানো হয়েছে রাজবাড়ীর বৈচিত্র্যময় সব অনুষঙ্গ:
ঐতিহাসিক বিবর্তন: গোয়ালন্দ থেকে পণ্ডিত কাজী আবুল হোসেন ও শিল্পী মনসুর উল করিমের স্মৃতিধন্য রাজবাড়ী হয়ে ওঠার ইতিহাস।
সংস্কৃতি ও শিল্প: মৃৎশিল্পের কারুকাজ, লোকজ খেলা এবং বিলুপ্তপ্রায় লোক-সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।
অর্থনৈতিক ঐতিহ্য: জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ‘ক্ষীর চমচম’-এর ইতিহাস এবং একে জি.আই. পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির প্রচেষ্টা।
স্মৃতি ও সংগ্রাম: ক্ষয়িষ্ণু জমিদারির ইতিবৃত্ত এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় বীরত্বগাথা।
জেলা প্রশাসকের আশাবাদ
মোড়ক উন্মোচনকালে জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, “এই জনপদ লোকসভ্যতায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রাজবাড়ীর ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এটি গবেষকদের জন্য আকর গ্রন্থ হিসেবে কাজ করবে।”
সমাপ্তি
রাজবাড়ীর ধূলিকণায় লুকিয়ে থাকা সত্য আর সুন্দরের সন্ধানে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য “রাজবাড়ী: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আখ্যান” সংগ্রহে রাখা একটি আবশ্যিক কাজ হতে পারে। নারায়ণ দেবনাথের মতো সৃজনশীল লেখকদের হাত ধরে রাজবাড়ীর প্রতিটি জনপদের ‘অমৃত কথা’ ছড়িয়ে পড়ুক লোকালয় থেকে দেশান্তরে—এমনটাই প্রত্যাশা সুধীমহলের।