নিজস্ব প্রতিবেদক:
ফরিদপুর জেলা সদর উপজেলার ৬নং মাচ্চর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড জয়দেবপুর গ্রামে এক প্রবাসী বিধবা নারীর বসতবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা করে স্বর্ণ ও নগদ অর্থ লুটপাট করেছে বলে এলাকাবাসী জানায়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি গত ৩ আগস্ট ঘটে। বিদেশ ফেরত শিল্পি বেগমের বাড়িতে একদল স্থানীয় সন্ত্রাসী সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে অন্তত তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং এক লক্ষ টাকারও বেশি নগদ অর্থ লুটে নেয়। এতে তার একমাত্র বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যায় এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ওই নারী।
হামলার মূল পরিকল্পনা ও ঘটনা প্রবাহ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রবাসী শিল্পি বেগম মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে কয়েক বছর কর্মরত ছিলেন। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সামান্য কিছু সঞ্চয় করে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর তিনি বাড়ির সংস্কার ও ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কিছু সোনা ও টাকা জমা রাখেন। তিনি সম্প্রতি একটি গরু বিক্রি করে নগদ টাকা ঘরে রেখেছিলেন বলে জানা গেছে। এসব সম্পদের খোঁজ পেয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী সেকেন মোল্লা ও আলমগীর মোল্লা গং পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
প্রতক্ষ্যদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা প্রথমে শিল্পি বেগমের মানসিক অসুস্থ ছেলেকে কেন্দ্র করে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়ায়। এরপর একটি ড্রাম ট্রাক নিয়ে এসে তার বাড়ির সামনের বারান্দা ভেঙে ফেলে, ঘরে প্রবেশ করে ভেতরের সমস্ত জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড করে দেয়। তারা আলমারিতে রাখা তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে নেয় এবং ঘরে আগুন লাগানোরও চেষ্টা করে।
এ সময় আশপাশের লোকজন ছুটে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। তবে তাদের কয়েকজনকে চিনতে পেরেছেন এলাকাবাসী। তারা অভিযোগ করেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছে।
বিধবা প্রবাসীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তি
প্রবাসী শিল্পি বেগম বলেন,“আমি একজন বিধবা নারী। বিদেশে গৃহপরিচারিকার কাজ করে, অমানবিক পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। দেশে ফিরে সন্তানদের একটু ভালোভাবে রাখবো, এই ছিল স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার ঘরে থাকা তিন ভরি সোনা, গরু বিক্রির টাকা—সব লুট করে নিয়ে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই তিনি ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ করতে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা নিতে টালবাহানা শুরু করে। বরং অভিযুক্তদের পক্ষের লোকজন তাকে বারবার মীমাংসার জন্য চাপ দিতে থাকে এবং মামলা না করার জন্য ভয়ভীতি দেখায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আমি সঠিক তদন্ত করে এর সুষ্ঠু বিচার যেন হয় সেই ব্যবস্থা করব।
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নারী প্রবাসীর সর্বস্ব লুট হয়ে যাওয়ার পরও কেন এখনো মামলা নেয়নি পুলিশ? কেন একটি এত বড় অপরাধকে "মীমাংসা"র নামে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে?
মানবাধিকার সংগঠন ও এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ও সচেতন মহল। তারা বলছেন,“একজন বিধবা নারী, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে শ্রম দিয়ে যা কিছু অর্জন করেছেন, তা লুট হয়ে গেল—এটা শুধু অপরাধ নয়, এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আমরা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও ভুক্তভোগীকে যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।”
এছাড়া এলাকার সাধারণ জনগণ অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এমন অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
একজন নারীর আর্তি, রাষ্ট্র কি শুনবে?
প্রবাসী শিল্পি বেগম এখন অসহায় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত মামলা রেকর্ড, লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
এখন দেখার বিষয়—এই ঘটনায় প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত হয়।