ঐতিহাসিক যুগ থেকেই শিক্ষা মানব সভ্যতার উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ও উন্নয়নের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ ও বাস্তব সম্পর্ক বিদ্যমান। কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী ও পুরুষ উভয়েই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৮০-এর দশকে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম। সামাজিক কুসংস্কার, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও নিরাপত্তাজনিত কারণে মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতো। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীরা দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল।
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে সরকার নারী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বিতরণ কর্মসূচি, বিনাবেতনে অধ্যয়নের সুযোগ এবং এসএসসি ফরম পূরণে আর্থিক সহায়তা প্রদান। ১৯৯৫ সাল থেকে অদ্যাবধি সরকার চারটি প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করে আসছে। এসব কর্মসূচির ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের আর্থিক দুশ্চিন্তা কমেছে এবং তারা কন্যা সন্তানের পড়ালেখার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
২০০৮ সাল থেকে সরকার ছাত্রদের জন্যও উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০১৯ সালের ব্যানবেইস জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে শিক্ষার্থীদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের অন্তভুক্তি ও পাশের হার বেশি। এটি প্রমাণ করে যে সরকারি সহায়তা ও সচেতনতার ফলে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায় (৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি) নারী শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণ শেষে অনেক নারী শিক্ষার্থী কর্মজগতে প্রবেশ করছে। নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পর অনেকেই গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে। আবার কেউ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করে নার্সিং পেশায় যুক্ত হচ্ছে কিংবা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার ও সমাজে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে।
শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে—প্রাথমিক শিক্ষা (শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি), মাধ্যমিক শিক্ষা (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি), উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা (একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) এবং উচ্চ শিক্ষা। এই প্রতিটি পর্যায় অতিক্রম করার মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে। শিক্ষার ফলে নারীরা পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারছে। তারা পরিবার ছোট রাখতে সচেতন হচ্ছে, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করছে এবং সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারেও অধিক যত্নশীল হচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ায় তাদের শিক্ষিত করা ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারি মেধাবৃত্তি, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং এসএসসি ফরম পূরণে আর্থিক সহায়তা নারী শিক্ষার প্রসারকে আরও বেগবান করেছে। এসব উদ্যোগ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলায় মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। সেখানে ২৫০ জন নারী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা সর্বসম্মতিক্রমে মত প্রকাশ করেন যে, নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কর্মসূচি তাদের শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
[ লেখক: পারমিস সুলতানা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী ]