ছাতক(সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ (বিউবো) ছাতক অফিস বর্তমানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের এক অন্ধকার চক্রে জড়িয়ে পড়েছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ধ্বংস করে দিয়েছে। অফিসটি এখন যেন "ঘুষ ও দুর্নীতির দুর্গ" এমনটাই অভিযোগ অসংখ্য ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয়দের। প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ যোগদানের পর থেকেই তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট, যারা খোলামেলাভাবে ঘুষ বাণিজ্য, মামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, মেরামত, নতুন সংযোগ, বিল সংশোধন সব ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। ঘুষ না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়, দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। ৩. অভিযোগ রয়েছে, মিটার রিডিং না দেখেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সুরাহা তো দূরের কথা, বরং নিরপরাধ গ্রাহকদের নামে বকেয়া বিলের মামলা দেওয়া হচ্ছে যাদের অনেকেই আসল গ্রাহকই নন।
ইসলামপুর ইউনিয়নের গণেশপুরের বাসিন্দা জাহিদ হাসান মোহাম্মদ রুহেলকে ২৬ অক্টোবর আকস্মিকভাবে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বকেয়া বিলের মামলায়। অথচ তাঁর নামে কোনো বকেয়া বিল ছিল না। পরে জানা যায়, প্রকৃত বকেয়া বিলধারী হলেন অন্য একজন নাজমুল হুদা (মিটার নং ৪৪২৭৩০৭০), যার ২ লাখ ১৭ হাজার টাকার পাওনা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, ওয়াপদা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অসৎ উদ্দেশ্যে জাহিদ হাসান রুহেলকে হয়রানি করা হয়েছে। ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর রুহেলকে আপোষের প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি আইনি প্রতিকার ও দায়ীদের শাস্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত ৭ নভেম্বর মন্ডলীভোগ এলাকায় মিটার চেক করার নামে ওয়াপদার কিছু বেসরকারি কর্মচারী স্থানীয়দের সঙ্গে অসদাচরণ ও ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আবুল খয়ের থানায় অভিযোগ দিলে, নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ বিষয়টি ‘রফাদফা’র উদ্যোগ নেন। কিন্তু সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে অফিসে গেলে, প্রকৌশলী তাদের ৪০ মিনিট দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে বৈঠক করেন এবং পরে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এমনকি পুলিশ ডেকে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। পরে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়, যার নৈপথ্যে ছিল সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যরা যাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় একজন সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি। বিদ্যুৎ অফিস সহ উপজেলার সকল দপ্তরেই রয়েছে তার মাসোহারা এবং আদিত্য। তদন্তে জানা গেছে, ‘লাইন মেরামত’ ও ‘নতুন সংযোগ’ প্রকল্পের বিল ওঠানোর সুযোগে প্রকৌশলী মজিদ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররা লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার হাসনাবাদ ইলামেরগাঁও এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের নামে ২ লাখ টাকার প্রকল্পে আগেই ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। এর আগে লাইন মেরামতের নামে ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত দুজনকে হাতে-নাতে সেনাবাহিনী আটক করেছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের তদবিরে চার্জশিটে সাক্ষীদের নাম বদলে নিরপরাধদের জড়ানো হয়, ফলে সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এছাড়া কার্ড মিটার অনিয়ম, বকেয়া বিলের জালিয়াতি, লাইনের অদক্ষ মেরামতের কারণে মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।একইভাবে ছাতকের পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে মিটার নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সংস্কার করে নতুন মিটার স্থাপনের জন্য দুই থেকে তিন লক্ষ টাকা লেনদেনের একাধিক তথ্য রয়েছে। বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল কাদের জানান, ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তে রয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্যও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।